সাদা ভাত, মুগের ডাল, কাঁঠালের বীজ-পটল-বেগুন-ডাটা দিয়ে চচ্চড়ি, কাঁচা ও পাকা পটল ভাঁজা, ছুয়াই শাকের টক, আমড়া সেদ্ধ, পেয়াজ-টমেটোর স্যালাদ, লেবু।

ফোনের রিংটোনে ঘুমটা ভেঙে গেল। ফোনটা রিসিভ করে কয়েক সেকেন্ড পর রাখার সময় ঘড়ি দেখলাম। দশটার বেশি বাজে। হাত মুখ ধুয়ে ঘরে এলাম। বেলা হয়েছে, স্বভাবতই খিদে পেয়ে গেছে। ম্যাগী খেলাম। শোবার ঘরে এসে বসলাম। নিজের ব্যক্তিগত কাজ করছিলাম, ইউটিউবে কিছু দেখছিলাম, সাথে একটা জরুরি চিন্তা ও মাথার মধ্যে সামন্তরাল ভাবে চলছিল। যদিও সমগ্র বিষয়টাকে থার্ড পার্সন ভিউতে একজন বামপন্থীর দৃষ্টিভঙ্গিতে পুঁজিবাদী প্র্যাকটিস, রাষ্ট্র যন্ত্র কিভাবে গরিব শ্রমিক শ্রেণীর নাগরিককে শোষণ করছে বলেই মনে হবে। যাহোক ব্যাসিক্যালী আমি ঘরে কেলিয়ে পড়ে ল্যাদ খাচ্ছিলাম ও বলতে পারেন একজন লিবুর দৃষ্টিভঙ্গীতে। হটাৎ ইউটিউবে কিছু একটা দেখবো মনে পড়ায় সামনের বারান্দায় চেয়ার টেনে বসলাম। পা দুটো সামনের চেয়ারে তুলে কানে হেডফোন দিয়ে ইউটিউব দেখতে লাগলাম। এদিকে বাইরে শো অলরেডি চালু। শো হলো জুলাই মাসের আবহাওয়া। রোদ, মেঘ, বৃষ্টি, হওয়ার র্যান্ডম খেলা। আমার তো বেশ লাগে। খেয়ালে খেয়ালে বেলা তিনটা বেজে গেছিল। চিন্তা ভাবনার খানিক ডুবে ছিলাম তাই খিদের কথা মনে পড়েনি। যদিও খিদে আগেই পেয়েছিল। খিদের কথা মনে পড়তেই শরীর এলার্ট মোডে চলে গেল। এক্সট্রিম অপ্টিমাইজেশনে পাওয়ার সেভিং মোড এ ইঞ্জিন চলছে। যেহেতু আমি একজন রক্ত মাংসের মানুষ তাই অনুভূতি নামক ঘটনাটা এক্টিভ রোলে চলে এল। “যেন” খিদের চোটে চোখে মুখে অন্ধকার দেখলাম। ব্রম্মতালু বন বন করে ঘুরে উঠলো। শরীর কেমন যেন অবসন্ন বোধ হতে লাগল। বাইক ট্রিপে গুরুদনগমার লেক গেছিলাম ২০১৭ এ, ১৮ হাজার ফুট উচ্চতায় অক্সিজেনের অভাবে আমাদের শরীর ও বাইকের কম্বস্টিং ইঞ্জিন কোনটাই ঠিকমত কাজ করছে না। চোখে ঝাপসা দেখে তিন জন চলন্ত বাইক নিয়ে শুয়ে পড়লাম তিব্বত মালভুমির পাদদেশে। দু তিন সেকেন্ডের মধ্যে আবার স্বজ্ঞান ও স্বাবাভিক। যেন টাইম মেশিনে করে ওই দু তিন সেকেন্ডের জন্য অন্য কোনো টাইম জোনে চলে গেছিলাম। খুলে গেছিল কোনো ওয়ার্ম হোল। পুনশ্চ ওয়ার্ম হোলের কথা মানসচক্ষে কল্পনা করে নিজের ঈমান জাগ্রত করে ফেলবেন না। খিদেয় আমার ক্ষণকালের জন্য এই উত্থিত মালভুমির অনুভব হয়েছিল। চেয়ারের হাতল ধরে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। ধুতির গিট কোনরকমে একটু শক্ত করে বেঁধে নিয়ে ঊর্ধস্বাসে হেঁসেলের দিকে ধেয়ে গেলাম। কাঁপা কাঁপা আশক্ত হাতে মিটসেফের/মিটকেসের দরজা খুলে হাত ঢুকিয়ে একে একে থালা বাটি বের করে আনতে লাগলাম। যেহেতু আমার হাত মাত্র দুটো তাই আমাকে একাধিক বার খাওয়ার টেবিল অবধি ট্রিপ মার্তে হলো। যখন সব নিয়ে চেয়ার টেনে বসলাম, সামনের দিকে তাকিয়ে আমার বুকে জল এল। করুণাময় ঈশ্বর এযাত্রা আমার প্রাণরক্ষা করলেন🙏 ইচ্ছা হলো একটা ছবি তুলে এই পবিত্র মুহূর্ত স্মৃতির এলবামে রেখে দিই। তাই এই ক্ষুধায় ভগ্নপ্রায় শরীরটাকে কোনরকমে টেনে হিচড়ে সিঁড়ি ভেঙে দোতালার কোনার ঘরে নিয়ে গেলাম কারণ মোবাইল ওখানেই ছিল। তারপর দ্রুত কয়েকটি ক্লিক করে খাদ্যগ্রহণে মনোনিবেশ করলাম।

প্রথমেই ভাতের থালাটিকে একটু কাছে টেনে নিয়ে ভাতের চূড়াটা ভেঙে ভাতগুলো সমান ভাবে বিছিয়ে নিলাম। এক কোনায় খানিক “বেশ ঘন” মুগের ডাল ঢেলে দিলাম। কিছুটা ভাত চপচপে করে মেখে নিলাম। চচ্চড়ি থেকে দুটি কাঁঠালের বীজ, এক টুকরো পটল, একটু বেগুন, একটু আলু নিয়ে ডাল দিয়ে মাখা ভাতের উপর রাখলাম। সবকিছু দিয়ে একটা গ্রাস বানিয়ে গোবিন্দর নাম নিয়ে অস্তে করে মুখে পুরে দিলাম। মর্মস্পর্শী ডালের স্বাদে চচ্চড়ির চটপটে স্বাদ সাপের শঙ্খ লাগার মত মিশে গেল। গলা বেয়ে যেন এক স্নিগ্ধতা নেমে গেল। আরেকবার একই রকম গ্রাস বানিয়ে মুখে চালান করে দিলাম। সাপের ছোবলের মত ক্ষিপ্রতায় হাত চলে গেল একফালি কাঁচা পটল ভাজার দিকে। চকিতে সেই পটলের একটুকরো কামড়ে ছিঁড়ে নিয়ে হাত চলে গেল একটি তেলে ভাজা নিটোল কাঁচালঙ্কায় দিকে। অর্ধেক মুখে পুরে নিলাম। লংকার। চিবাতে লাগলাম। দুবার চিবিয়ে দুটো কাঁচা পেঁয়াজের গোল করে কাটা রিং মুখে পুরে দিলাম। ডালের মর্মস্পর্শী স্বাদ, চচ্চড়ির চটপটি, পটলের কটমটে মিষ্টতা, লংকার ঝাল,পেঁয়াজের ঝাঁজ একসাথে তান্ডব নৃত্য করতে লাগলো। যেন স্বাদের সিম্ফোনি। সমগ্র খাদ্যমণ্ডটিকে গলধগরণ করার পর এক টুকরো পাকা টমেটো খেয়ে প্যালেট টাকে ধুয়ে নিলাম। আঙুলের ডগায় করে একটু চুয়াই শাকের টক জিভে চেটে পুনরায় গ্রাসের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করলাম। এ এক বড় জটিল তালমেলের পদ্ধতি। একটু ভুলচুক হলেই সমগ্র নেশাই চোটে যাবে। যাহোক এভাবে ডাল ভাত সবজি ভাজা খেয়ে পরবর্তী ধাপে বহু কাঙ্খিত মহামূল্যবান পোদফলের দিকে লক্ষ্যস্থীর করলাম।

বাকি ভাতগুলো বালি সিমেন্ট মাখানোর মত করে মাঝে একটু জায়গা তৈরি করলাম। তারপর সেখানে ডিমের ঝোল ঢেলে দিলাম। কিছুটা ঝোল অবশ্য বাটিতেই উদ্দেশ্যপ্রাণোদিত ভাবে রেখে দিলাম। এক টুকরো পাতিলেবু ভাত তরকারীর উপর নিংড়ে দিলাম মন নরম করে। সব একসাথে মেখে নিলাম। এবার থালার একপাশে একটু ভাত সরিয়ে জায়গা করে ডিম দুটো বেছে রাখলাম। তারপর চার টুকরো আলু অক্ষত অবস্থায় বেছে একপাশে রাখলাম। এরপর শল্যচিকিৎসকের নিপুনতায় ডিম দুটির পেট চিরে বার করে আনলাম কুসুম। রক্তাভ ঝোল মাখা আমার পৈশাচিক লোভী আঙুলগুলো দিয়ে থেতলে দিলাম দুটি না জন্মানো ভ্রূণের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। বাটিতে বাঁচিয়ে রাখা সেই রগরগে তৈলাক্ত ঝোল মেশালাম থেতলে দেওয়া কুসুমের সাথে। একটা ক্রিমি পেস্ট তৈরি করলাম। বেশ খানিকটা হয়েছে। উচুকরে রাখা কুসুমের পেস্টের দিকে তাকিয়ে জিভে জল এল। নিজেকে সংবরণ করলাম। কুসুম মাখার পর আঙুলে লেগে থাকা উমামী লেই চেটে ও চুষে সাফ করলাম। খেতে খেতে জল তেষ্টা পেয়েছিল। কিন্তু লালসার তাড়নায় ভাবলাম এক গ্রাস ভাত খেয়েই জল গ্রহণ করবো। আচমকা প্রাণবায়ু গোবিন্দের কৃপায় যদি এই নঃশ্বর দেহ ত্যাগ করে সৃষ্টির অপরপ্রান্তে গমনে উদ্যত হয় তবে হাঁসের ডিমের ঝোল ভাতের জন্য আমার এ আত্মা অনন্তকাল এ ইহলোকে কেঁদে কেঁদে বেড়াবে মুক্তির আশায়। নিজের উপর এহেন অবিচার আমার ধম্মে সইবে না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম এক গ্রাস ভাত মুখে তুলে দেওয়ার। এক টুকরো মখমলে আলু ভেঙে নিলাম। ঝোল দিয়ে মাখা ভাতের এককোনে রাখলাম। একটু ডিমের সাদা অংশ ভেঙে আলুর পাশে রাখলাম। একটা গ্রাস বানিয়ে মুখে পুরে দিয়েই তড়িৎগতিতে দু আঙুলের ডগায় ওই কুসুমের লেই তুলে জিভে চাটতে লাগলাম। ঝাল, মশলার গন্ধে কুসুমের গাঢ়তায় আবেশে আমার চোখ বুজে এল। মুখের মধ্যে যেন জলের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। আগের পাওয়া জল তেষ্টা মিটে গেল। চোখ খুলে কাঁচা পেঁয়াজের রিং মুখে দিলাম। ঝালমশলার উত্তাপ যেন পেঁয়াজের সুমিষ্ট নির্মল ঝাঁজে স্তিমিত হয়ে গেল। সুখানুভুতির আবেশে মুখ দিয়ে অর্গাজম সূচক আওয়াজ বের হয়ে গেল অজান্তেই। পুলকে পুলকে শিহরিত হল এ তন-মন। সবশেষে পাকা টোমেট , চুয়াই শাকের টক ও কাঁচা আমড়া সেদ্ধ দিয়ে মুখটাকে পরিশ্রুত করে পরবীর্ত গ্রাসের জন্য প্রস্তুত করে নিতে লাগলাম নিজেকে।

এভাবেই সব ভাত শেষ করে আয়েশে কিছুক্ষন চোখ বুজে স্থির হয়ে বসে রইলাম। যেন যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলাম। একটু ধাতস্থ হয়ে বাটিতে একটু বাঁচিয়ে রাখা ডাল চুমুক দিয়ে খেয়ে আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে এলাম। একফালি পাকা পটল বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। ডালের সাথে ব্যালেন্স করে তার স্বাদ পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পর্যবেক্ষণ পূর্বক স্মৃতিতে সঞ্চয় করলাম। বাটিতে সামান্য ঝোল ও ছিল। থালার অবশিষ্ট কুসুমের লেইটুকু চেটে চেটে সাফ করে খেয়ে ঝোল আঙুলে করে চাটতে লাগলাম। ঝড় শেষে যেন ঝিরি ঝিরি বৃস্টির আমেজ। ওয়াহ। অবশিষ্ট পেঁয়াজ টমেটো খেয়ে ফেললাম। চুয়াই শাকের টক টুকু চেটে পেঁয়াজ টমেটোর স্বাদকে বিদায় জানালাম। শেষে আমড়ার আঁটি চুষতে চুষতে সজল নয়নে খালি থালাকে বিদায় জানালাম।

গোবিন্দর কৃপায় হালকা গরিবানা মতে মুগের ডাল, কাঁঠালের বীজ-ডাটা-বেগুন-পটল-আলু দিয়ে চচ্চড়ি, হাঁসের ডিমের রগরগে ঝোল, কাঁচা ও পাকা পটল ভাজা, চুয়াই শাকের টক, সেদ্ধ আমড়া, পেঁয়াজ টমেটোর স্যালাড ও লেবু দিয়ে সালফা করে পিত্তরক্ষার এক অতিক্ষুদ্র প্রয়াস করলাম

আপনাদের মতামত বা কোন জিজ্ঞাসা কমেন্ট করে জানান। রেসিপি জানতে কমেন্ট করুন নাম ও ইমেল সহ। নতুন আপডেটের জন্য সাবস্ক্রাইব করুন বাদিকে ঘণ্টার আইকন ক্লিক করে।



Leave a Reply

Your email address will not be published.